সায়েরা তখনো কেবল ভ্রূণ,
পরম নিশ্চিন্তে মায়ের গর্ভে। মা, লাক্স তারকা ও ছোট পর্দার জনপ্রিয় মুখ
আজমেরী হক বাঁধন। তিনি তখন একটা প্রশ্ন বারবার জিজ্ঞেস করে ‘পাগল’ করে
ফেলেছিলেন ডাক্তারদের। ‘আমার ছেলে হবে, না মেয়ে?’ একটা কন্যাসন্তানের জন্য
উন্মুখ ছিলেন তিনি। তারপর এল ২০১১ সালের ৬ অক্টোবর দিনটি। সেদিন মা আর
মেয়ের প্রথম চোখাচোখি হলো। এত খুশি, সুখের অশ্রু আর আশ্বস্ত হওয়া দেখে
ডাক্তার বলেই ফেললেন, ‘ভাগ্যিস...আপনার হাবভাব দেখে তো মনে হচ্ছে ছেলে হলে
কোলেই নিতেন না!’
তারপর পেরিয়ে গেল ৮ বসন্ত। ২০১০ সালে হুট করে বিয়ে করা স্বামীর সঙ্গে
বিচ্ছেদটাও ঘটল হুট করেই। মিডিয়ার সঙ্গে লুকোচুরি, আইনি লড়াই, বিষণ্নতা,
দিনের পর দিন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে কাউন্সেলিং, একা মায়ের যুদ্ধ—সব শেষে
এই ফেরা। ৮ বছরের দুঃসময় পেছনে ফেলে এসে এখন যেমন আছেন—বাঁধনের ভাষায়, একেই
বোধ হয় বলে ভালো থাকা। মন খুলে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বললেন পেরিয়ে আসা সেই
সব সময় আর বর্তমান নিয়ে।
এক ডজন ছবিতে মা–মেয়ের গল্প। ছবিগুলো ইনস্টাগ্রাম আর বাঁধনের কাছ থেকে নেওয়া।

ফেসবুক
আর ইনস্টাগ্রামে এই মা–মেয়ের মিলিয়ে পরা পোশাক বেশ জনপ্রিয়।
মিডিয়ায় ‘একা
মা’ (সিঙ্গেল মাদার) হিসেবে বেশ নামডাক আছে বাঁধনের। জীবনভর একটা বোনের
বড্ড অভাব বোধ করেছেন বাঁধন। ইচ্ছা ছিল, একটা বোন থাকবে। তারপর দুই বোন
মিলিয়ে মিলিয়ে সব জামা বানাবেন। সেই ইচ্ছা পূরণ করেছেন সায়েরাকে দিয়ে।
সায়েরার যখন মাত্র আড়াই মাস বয়স, তখনই একই প্রিন্টের কাপড় দিয়ে বানিয়ে
ফেললেন নিজের আর মেয়ের জন্য হলুদ রঙা কামিজ। সেই থেকে চলছে। এই মুহূর্তে এই
মা–মেয়ের আলমারিতে আছে প্রায় অর্ধশত একই পোশাক।

বিয়ে
ভেঙে গেল ২০১৪ সালে। বিবাহবিচ্ছেদের কথা দীর্ঘদিন গোপন রেখেছিলেন বাঁধন।
বিচ্ছেদের পরেও সন্তান যাতে বাবা না হারায়, সে জন্য সম্ভব সবকিছুই করেছেন।
বাঁধনের ভাষায়, ‘বিচ্ছেদের পরেও আমরা সন্তান নিয়ে মালয়েশিয়া গিয়েছি। ২০১৭
সালের জুলাই মাসের ঘটনা। সেখানে গিয়ে সায়েরার দিকে তাকিয়ে আমি সিদ্ধান্ত
নিই, ওর বাবাকেই আবার বিয়ে করব। সে–ও রাজি। সব ঠিক। ফিরে কিছুদিন পর
(আগস্টের প্রথম সপ্তাহে) শুনলাম, ওই লোক (সায়েরার বাবা) আরেকটা বিয়ে করেছে।
অথচ আমাকে বা আমার মেয়েকে কিচ্ছু জানায়নি।’ ছবিটি সেই মালয়েশিয়া ট্যুরের,
বাবা–মায়ের সঙ্গে সায়েরার শেষ ছবি।
তারপরও
সায়েরার যাতে সৎমায়ের ক্ষেত্রে ‘সিনড্রেলা’র অনুভূতি না হয়, তাই তার বাবার
বাসায় পাঠাতেন বাঁধন। বাঁধনের ভাষ্যমতে, তাঁর সাবেক স্বামী নাকি নিয়মিত
মেয়ের ‘ব্রেইন ওয়াশ’ করতেন। বোঝাতেন যে বাংলাদেশ ভালো না, কানাডা ভালো।
তারপর একদিন মেয়েকে বাসায় ‘আটকে রেখে’ সায়েরার বাবা ফোন করে বাঁধনকে জানান,
মেয়ে আর বর্তমান স্ত্রীকে নিয়ে কানাডা চলে যেতে চান তিনি। এই কথা শুনে
পাগলপ্রায় হয়ে যান বাঁধন।
২০১৭
সালে সায়েরার বয়স যখন ৬ বছর, তখন মামলা ঠুকে দেন বাঁধন। সায়েরার বাবা
অবশ্য এর আগেই ২০১৪ সালে মামলা করেছিলেন ‘চাঁদাবাজি, প্রতারণা ও
চরিত্রহীনতার’ অভিযোগ এনে। সেই মামলা আদালত খারিজ করে দেন। বাঁধনের ভাষায়,
‘সে নিজেই মদ খেয়ে এসে আমার গেট ভাঙচুর করেছে। আমার গায়ে হাত তুলেছে।
বিচ্ছেদের আগে এই সব আজগুবি মামলা করেছে।’ জেতেন বাঁধন। মেয়ের অভিভাবকত্ব
দাবি করেন। ২০১৮ সালের ৩০ এপ্রিল আদালতের রায়ে মেয়ের অভিভাবকত্ব পান বাঁধন।
সায়েরার পাসপোর্ট ছিল তার বাবার কাছে। আদালতই দায়িত্ব নিয়ে নোটিশ পাঠিয়ে
বাবার এনওসি (নো অবজেকশন সার্টিফিকেট) ছাড়াই নতুন পাসপোর্ট বানানোর
ব্যবস্থা করে দেন। বিয়ের ৫ লাখ টাকার দেনমোহরের দাবি করেননি। দাবি করেননি
মেয়ের কোনো খোরপোশ। মেয়ের দায়িত্ব বুঝে নিয়ে এই মা-মেয়ে নতুন জীবন শুরু
করার আগে গেল যুক্তরাষ্ট্রে। ভিসার সাক্ষাৎকারের দিন নাকি অনেক দোয়া
পড়েছিলেন বাঁধন। কারণ, ‘লোকে’ বলেছিল, মার্কিন অ্যাম্বাসি হয়তো ভিসা দেবে
না। তারা ভাববে, সিঙ্গেল মা আর মেয়ে ওখানে অবৈধভবে স্থায়ী হওয়ার জন্য
যাচ্ছে, কিন্তু এ ধরনের কোনো প্রশ্নই করেনি। আর এখন পর্যন্ত সেটিই নাকি
মা–মেয়ের সবচেয়ে প্রিয় ভ্রমণ।

সেই
থেকে সায়েরা আছে মায়ের সঙ্গে। বাবা ব্যবসায়ী মাশরুর সিদ্দিকী কোনো দিন
দেখতে আসেননি মেয়েকে। মায়ের কাছে মেয়েই সব। মেয়েও মাকে জানে মা আর বাবা।
বাঁধন
বলেন, ‘ভয়ংকর দুঃসময়ে আমি আমার মেয়েকে আঁকড়ে ধরে বেঁচেছি। ও ছাড়া আমার আর
কিছুই ছিল না। দীর্ঘদিন আমাকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে চলতে হয়েছে।
তিনি আমাকে বলেছিলেন, আমি যেন সায়েরার বাইরে নিজের একটা জগৎ গড়ে তুলি।’
জানতে চাইলাম, ‘কেন, তখনো তো কাজ করছিলেন, তা–ই না?’ উত্তর এল, ‘হ্যাঁ। তখন
আমি নিরাপত্তাহীনতা, অস্তিত্বহীনতা থেকে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছি। কাজটা মন
দিয়েই করেছি; কিন্তু আমার ভালো লাগা–মন্দ লাগা—এসব কিছুই মাথায় ছিল না তখন।
দিনে ১৬ ঘণ্টা, ১৮ ঘণ্টাও কাজ করেছি। শুধু ভাবতাম, আমার ভবিষ্যৎ কী? আমার
মেয়ের ভবিষ্যৎ কী? ওর ভালো বিয়ে হবে তো? কাজগুলো আমি কেবল টাকার জন্য
করেছি। তাই কাজ করে মোটেও আনন্দ পাচ্ছিলাম না। তারপর না বলা শুরু করলাম।
নিজের খুশিতে কাজ করা শুরু করলাম।’
‘সিঙ্গেল
মা’ হিসেবে সবচেয়ে বড় সংকট কী? বাঁধনের উত্তর, ‘নিজেকে সমাজের সঙ্গে
মানিয়ে নেওয়া। কারণ, সমাজ তো আমাদের জন্য এখনো তৈরি না। আর একসঙ্গে মা–বাবা
দুটো রোল প্লে করাও খুব চ্যালেঞ্জিং। অর্থ উপার্জন করা, সায়েরা যাতে বাবার
অভাব বোধ না করে, এ জন্য আমি জজকে বলেছিলাম, যাতে ওর বাবা নিয়মিত দেখা
করে। অবশ্য জজ তখন জানিয়েছিলেন, বাবা সন্তানকে কতটা ভালোবাসবে, সেটা তো
তিনি আইন করে ঠিক করে দিতে পারেন না। যদিও আইন অনুসারে ওর বাবার মাসে দুই
দিন দেখা করার কথা, কিন্তু সেটা কখনোই ঘটেনি। আমি সব সময় অন্যদের বলি,
তাঁরা যেন আলাদা হয়ে যাওয়ার পরও নিজেদের ইগো সামলে সন্তানের দায়িত্ব,
কর্তব্য ভাগাভাগি করে নেন।’
সায়েরা
এখন রাজধানীর একটা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে পড়ছে। বড় হয়ে সে
স্থপতি হতে চায়। সায়েরার কাছে জানতে চাইলাম, মাকে সে ১০–এ কত নম্বর দিতে
চায়। তিন শব্দের উত্তর এল, ‘টেন অন টেন।’
এই মা–মেয়ে ঘুরে বেড়ায় বিশ্বের নানা প্রান্তে। বাঁধন জানিয়েছেন, মেয়েই তাঁর সবচেয়ে কাছের বন্ধু।

মায়ের প্রিয় খাবার মিষ্টি, মেয়ের আইসক্রিম।
সায়েরা যখন মাতৃগর্ভে, তখন বাঁধনের ওজন হয়েছিল ৮৭ কেজি। এখন সেটা কমিয়ে
পাঁচের ঘরে এনে তুলেছেন। আজ যখন আলাপ চলছে, তখনো মেয়েকে স্কুলে দিয়ে জিমে
যাচ্ছেন। আবার মেয়েকে স্কুল থেকে নিয়ে বাসায় ফিরবেন। এখন তিনি বাবা–মায়ের
সঙ্গে মিরপুরে থাকেন।
আবার বিয়ে করার পরিকল্পনা আছে? বাঁধন বললেন পরিকল্পনা নেই। কারণ, এই মা
আর মেয়ে দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে আছে। তারা জানে না, তাদের সঙ্গে একজন পুরুষ
এলে সেটা কেমন হবে। তাই কিছুটা ভয় পান বাঁধন। তবে পরিকল্পনা করে তো আর কিছু
হয় না। সময়ই উত্তর দেবে। আর সময়ের আগে সায়েরা সাফ বলে দিয়েছে, ‘মা, তুমি
তো শুধু ভুল করো। এবার আমরা দুজনে মিলে ঠিক করব কে হবে সেই মানুষ।’
Comments
Post a Comment