
প্রি টার্ম বার্থ কী
সাধারণত প্রেগনেন্সির সময় মোটামুটি ৪০ সপ্তাহ। তবে যদি কোনও কারণে ৩৭ সপ্তাহের আগেই শিশুর জন্ম হয়ে যায়, তাহলে তাকে ডাক্তারি পরিভাষায় প্রি ম্যাচিওরড বার্থ বলে। তবে ঠিক কত সপ্তাহে ডেলিভারি হচ্ছে, তার উপর ভিত্তি করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রি টার্ম বার্থ-এরও তিনটি আলাদা বিভাজন করেছে। যদি ২৮ সপ্তাহের আগেই ডেলিভারি হয়ে যায়, তাহলে সেটি ‘একস্ট্রিমলি প্রি টার্ম’। প্রেগনেন্সির ২৮ থেকে ৩২ সপ্তাহের মধ্যে সন্তানের জন্ম হলে তাকে বলা হয় ‘ভেরি প্রি টার্ম’। আর ৩২ থেকে ৩৭ সপ্তাহের মধ্যে জন্মালে সেটি ‘মডারেট’ বা লেট প্রিটার্ম’ ডেলিভারি। পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যাবে, প্রতি বছর সারা বিশ্বে প্রায় দেড় কোটি প্রি ম্যাচিওরড শিশু জন্মায়। অর্থাত্ প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে একজন শিশু প্রি ম্যাচিওরড। আর এই হার গত ২০ বছরে বেড়েছে দ্রুত।
কারণ ও সতর্কতা
প্রি ম্যাচিওরড ডেলিভারি হওয়ার পিছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। যাঁরা বেশি বয়সে মা হন, তাঁদের অনেকের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা বেশি থাকে। এছাড়া প্রেগনেন্সির সময় যদি জেস্টেশেনাল ডায়াবিটিস বা অন্য কোনও সমস্যা দেখা দিলে, বন্ধ্যাত্বের চিকিত্সার দরুণ মাল্টিপল প্রেগনেন্সি বা একাধিক সিজ়ারিয়ান ডেলিভারি হলেও এই সমস্যা হতে পারে। ২৫ শতাংশ প্রি টার্ম বার্থের ক্ষেত্রে হবু মায়ের কিডনির সমস্যা থাকলে, প্রি ইকল্যাম্পসিয়া (এর ফলে প্রেগনেন্সির সময় উচ্চ রক্তচাপ ও ফ্লুইড রিটেনশনের সমস্যা দেখা যায়) থাকলে, সন্তান সুপুষ্ট না হলে সময়ের আগেই মায়ের সিজ়ারিয়ান ডেলিভারি করে দিতে হয়। অন্তত ২০ শতাংশ ক্ষেত্রে সময়ের আগেই মেমব্রেন রাপচার হয়ে গেলে প্রি টার্ম বার্থ হতে পারে। ২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রেগনেন্সির সময় হঠাত্ ব্লিডিংয়ের মতো ইমার্জেন্সির ফলে ডেলিভারি সময়ের আগেই হয়ে যায়। তবে বাকি ৩০ শতাংশ প্রি ম্যাচিওরড বার্থ-এর কারণ এখনও অজানা। প্রেগনেন্সির সময় কয়েকটি সতর্কতা অবলম্বন করলে প্রি টার্ম ডেলিভারির সম্ভাবনা কিছুটা কমানো যায়। কনসিভ করার আগে ডাক্তারের কাছে নিয়মিত চেক-আপ করান। একে বলে প্রিকনসেপশন ভিজ়িট। ডাক্তার দেখে নেবেন আপনি যে ওষুধগুলো খাচ্ছেন সেগুলো আপনার উপযুক্ত কি না। যাঁরা বন্ধ্যাত্বের চিকিত্সা করাচ্ছেন তাঁদের সিঙ্গল প্রেগনেন্সিতে প্রি ম্যাচিওরড ডেলিভারির সম্ভাবনা তুলনায় কম। তবে টুইন বা ট্রিপলেটের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা বাড়তে পারে। প্রেগনেন্সির আগে ওজন কমানো জরুরি। ওবিসিটি থাকলে প্রি টার্ম ডেলিভারি হতে পারে। প্রেগনেন্সির আগে নিয়মিত এক্সারসাইজ় করুন, ব্যালেন্সড ডায়েট খান। প্রেগনেন্সির সময় ডায়েটিং চলবে না। ধূমপান করবেন না। স্ট্রেস সরিয়ে রাখুন। আর প্রেগনেন্সির সময় ফ্লু যাতে না হয়, সেজন্য ফ্লু শট নিয়ে রাখুন। এগুলো সবই প্রি টার্ম বার্থের কারণ হতে পারে।
প্রি ম্যাচিওরড শিশুর সমস্যা
সময়ের আগে সন্তান জন্মালে কিছু শারীরিক সমস্যা হতে পারে। যে শিশুরা প্রেগনেন্সির ৩৪ সপ্তাহের আগেই ভূমিষ্ঠ হয়ে যায়, তাঁদের রেসপিরেটরি ডিসট্রেস সিনড্রোম হতে পারে। এদের শরীরে সারফেকটেন্ট বলে একটি প্রোটিনের অভাব থাকে। ফলে, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। এদের ফুসফুসের এয়ারপাইপে সারফেকটেন্ট দেওয়া হয়। প্রয়োজনে রেসপিরেটরি সাপোর্ট (যেমন ভেন্টিলেশন, হাই ফ্রিকোয়েন্সি অসিলিয়েশন) ইত্যাদিও দেওয়া হতে পারে। যে শিশুরা ৩২ সপ্তাহের আগেই ভূমিষ্ঠ হয়, তাদের অ্যাপনিয়া হতে পারে। এক্ষেত্রে ২০ সেকেন্ডের বেশি সময় নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। এরসঙ্গে শিশুর স্লো হার্ট রেটের সমস্যাও থাকতে পারে। এদের মস্তিষ্ক পরিণত না হওয়ায়, এরা শ্বাস নিতে ভুলে যায়। তাই কফি থেকে তৈরি একধরনের ওষুধ, যাকে ক্যাফেন বলে, তার সাহায্যে মস্তিষ্ক সজাগ রাখার কাজ করা হয়। এতে এরা নিয়মিত নিঃশ্বাস নিতে পারে। প্রি ম্যাচিওরড শিশুদের শরীরের ইমিউনিটি সিস্টেম দূর্বল হওয়ায় ইনফেকশনের মোকাবিলা করার ক্ষমতা কম থাকে। ফুসফুসের ইনফেকশন, সেপসিস (রক্তের ইনফেকশন) ইত্যাজিও হতে পারে। ইনফেকশন হলে অ্যান্টিবায়োটিকের সাহায্যে খুব দ্রুত চিকিত্সা করাতে হবে। আবার অনেক শিশুর মস্তিষ্কে ইন্ট্রাভেন্ট্রিকুলার হেমারেজ হতে পারে। রক্তক্ষরণ বেশি হলে দীর্ঘকালীন নার্ভের সমস্যা হতে পারে। বড় হয়ে খিঁচুনি, সেরিব্রাল পলসি হতে পারে বা শিশুর বিকাশে বিঘ্ন ঘটতে পারে। এছাড়া পেটেন্ট ডাক্টাস আর্টারিওসিস বলে একটি অসুখ হতে পারে। এক্ষেত্রে হার্টের কাছে দুটি প্রধান রক্তনালীর সংযোগস্থলে সমস্যা হয়। এই অংশ (ডাক্টাস) যদি পুরোপুরি বন্ধ না হয়, তাহলে শিশুর নিঃশ্বাসের সমস্যা বা হার্ট ফেলিওর হতে পারে। ওষুধ দিয়ে চিকিত্সা করা যেতে পারে। নাহলে সার্জারি করতে হতে পারে। শিশুর অন্ত্রে নেক্রোটাইজ়িং এন্টেরোকোলাইটিস হতে পারে। এর ফলে পেট ফুলে যেতে পারে, ডায়রিয়া হতে পারে। জন্মের পরে ২-৩ সপ্তাহের মধ্যে এ সমস্যা দেখা দিতে পারে। ইন্ট্রাভেনাস অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে বা ধমনীর মধ্যে দিয়ে পুষ্টি পৌঁছনোর মাধ্যমে এর চিকিত্সা করা হয়। প্রয়োজনে সার্জারিও করতে হতে পারে। এছাড়া প্রিম্যাচিওরিটি-জনিত রেটিনোপ্যাথি হতে পারে। কিছু শিশু ফুড পাইপে, হার্টে জন্মগত অস্বাভাবিকতা নিয়ে জন্মায়। এদের সার্জারি ছাড়া আর কোনও চিকিত্সা নেই। যাদের ওজন খুব কম হয় ও যারা এক্সট্রিমলি প্রি ম্যাচিওরড হয়, তাদের নিওন্যাটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে রাখা প্রয়োজন। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে। যাঁরা সময়ের আগে ভূমিষ্ঠ হন, বড় হয়ে তাঁদের কয়েকজনের নিউরোলজিক্যাল সমস্যা দেখা দিতে পারে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে চোখে কম দেখার সমস্যাও হতে পারে।
Comments
Post a Comment