দীর্ঘ দুই দশক একাধারে রাজত্ব করেছেন যুব
মহিলা লীগের সভাপতি নাজমা আকতার ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপিকা অপু উকিল।
সংগঠনটি তাদের হাত দিয়ে গঠন হওয়ার পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত একই পদে রয়েছেন
তারা। অন্য কাউকে সুযোগও দিচ্ছেন না। ক্ষমতাবলে ‘পদ’-বাণিজ্য থেকে শুরু করে
টেন্ডার-বাণিজ্য, তদবিরসহ বিভিন্ন অপরাধের বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন
গোয়েন্দা সংস্থা।
তবে যুবমহিলা লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির এই
দুই নেত্রীসহ ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার সভাপতি সাবিনা আক্তার তুহিনের
নেতৃত্বের অবসান হচ্ছে আগামী এপ্রিল মাসে। যুবলীগের মতো তাদের সম্মেলন থেকে
দূরে রেখে নতুন কাউকে দায়িত্ব দেয়া হবে বলে আওয়ামী লীগের এক সিনিয়র নেতা
মানবকণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন।
যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি
বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে সম্মেলনের দাবি জানাচ্ছেন আগামী সম্মেলনের
পদপ্রত্যাশী। তারা এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের বাসা কিংবা
অফিসের ভিড় করছেন। জানান দিচ্ছেন নিজেদের প্রত্যাশীর কথা। যুব মহিলা লীগের
কেন্দ্রীয় কমিটিতে আসতে এরই মধ্যে লবিং-তদবির করছেন পদপ্রত্যাশীরা।
তথ্যমতে, সর্বশেষ ২০১৭ সালের ১১ মার্চ
রাজধানীর খামারবাড়ীর কৃষিবিদ ইনস্টটিউিশন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সম্মলেনের
মাধ্যমে টানা সভাপতি-সম্পাদকের দায়িত্ব পান নাজমা আক্তার ও অধ্যপিকা অপু
উকিল। এর আগে ২০০২ সালে নাজমা-অপু যুগলের হাত ধরে যাত্রা শুরু করে যুব
মহিলা লীগ। ২০১৪ সালের ৫ মার্চ দলটির প্রথম কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়।
কাউন্সিলে নাজমাকে সভাপতি ও অপুকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।
দলটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চলতি বছরের
মার্চে বর্তমান কমিটির মেয়ার শেষ হওয়ার কথা। এর আগে ক্যাসিনো, দুর্নীতি,
চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগে গত
বছরের ৬, ৯, ১৬, ২৩ ও ২৯ নভেম্বর যথাক্রমে কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগ,
স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুবলীগ ও মৎস্যজীবী লীগের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই
সম্মেলনের মধ্যদিয়ে বিতর্কিত নেতাদের সংগঠন থেকে ছেটে ফেলে আওয়ামী লীগের
সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
জানা যায়, শাহজালাল আন্তর্জাতিক
বিমানবন্দর থেকে নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক শামীমা নূর
পাপিয়া ও তার স্বামীসহ আরো চারজনকে আটক করে র্যাব। যুব মহিলা লীগের নেত্রী
জমজমাট নারী ব্যবসাসহ ভয়ঙ্কর সব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। স¤প্রতি
ওই নেত্রীর এমন কর্মকাণ্ডের পর সব অভিযোগের তীর এখন যুব মহিলা লীগের
সভাপতি নাজমা আকতার ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপিকা অপু উকিলের দিকে।
অন্যদিকে ঢাকা মহানগর-উত্তর শাখার সভাপতি
সাবিনা আক্তার তুহিনের দিকে যাচ্ছে অভিযোগের তীর। মূলত তাদের অনুসারী
হিসেবে বেশি পরিচিত শামীম নূর পাপিয়া।
পাপিয়ার আটকের পর তুহিন সামাজিক যোগাযোগ
মাধ্যমে বলেছেন, পাপিয়া এতো বড় কাজ একা করতে পারে না। অবশ্যই পাপিয়ার সঙ্গে
অন্য কেউ জড়িত আছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তার সাথে আমার কোনো সম্পৃক্ত পেলে
আমাকেও গ্রেফতার করা হবে। কারো জন্য যুব মহিলা লীগ কলঙ্কিত হতে পারে না।
আমি ব্যক্তিগত অপরাধ করলে তার দায়ভার আমার। সংগঠন কখনো দায়ভার নিতে পারে
না।
এমন অবস্থায় গত বুধবার দুপুরে গণভবনে
আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন যুব
মহিলা লীগ সভাপতি-সম্পাদক। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তাদের সংগঠনে শুদ্ধি অভিযান
চালানোর নির্দেশ দিয়ে বলেন, আমার কাছে অনেক রিপোর্ট আসছে, অনেকের নাম আছে।
আমি কাউকে ছাড়ব না। রাত-দিন পরিশ্রম করে দেশের জন্য কাজ করছি। আর সংগঠনের
নাম ভাঙিয়ে অপকর্ম করবে? আমি কাউকে ছাড়ব না।
এর আগে ২৪ ফেব্রুয়ারি শেখ হাসিনার
সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের সভায় এ ব্যাপারে আলোচনা
হয়। সভায় যুব মহিলা লীগের বর্তমান কমিটি ভেঙে দিয়ে যত দ্রুত সম্ভব নতুন
কমিটি গঠন করার জন্য দলের সিনিয়র নেতারা প্রধানমন্ত্রীকে পরামর্শ দেন।
এমনকি, যুব মহিলা লীগ বিলুপ্ত করার পরামর্শও দেয়া হয় সভায়।
সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই যুব মহিলা
লীগের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ নরসিংদী জেলা যুব
মহিলা লীগের সদ্য বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক শামীমা নূর পাপিয়ার গ্রেফতার
হওয়ার পর একের পর এক অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে এই সংগঠনের দায়িত্বশীল
নেত্রীদের বিরুদ্ধে। ফলে যুব মহিলা লীগের বর্তমান কমিটির যত দ্রুত্ব সম্ভব
সম্মেলন করতে চায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।
দলটির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, আগামী
এপ্রিল মাসের সম্মেলনের জন্য প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে সংগঠনের
বিভিন্ন পর্যায়ের নেত্রীদের সিগন্যাল দেয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ
নাসিম বলেছেন, সর্ব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ আজ আলোকিত। তার মধ্যে কিছু কষ্ট
আছে, কষ্টগুলো হলো দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পর কেন এই দেশে সম্রাট ও পাপিয়ার
মতো দুর্নীতিবাজদের জš§ হবে। তা?দের কার?ণে আজ আমা?দের সব অর্জন নষ্ট হ?য়ে
যা?চ্ছে। তিনি আরো ব?লেন, এরশাদ ও খালেদার বিরুদ্ধে লড়াই করে রাস্তায়
পুলিশের মার খেয়েছি, জেল খেটেছি। তখন কোথায় ছিল এই দুর্নীতিবাজরা? কখনো
রাসেল স্কয়ারে দেখিনি এদের। খুঁজে বের করতে হবে এদের কে সৃষ্টি করেছে? আজ
সবাই আওয়ামী লীগ হয়ে গেছে, আন্দোলনের সময় হাতেগোনা লোক দেখতাম। এদের জন্য
লজ্জা আমার, আমাদের সবার।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম
মোজাম্মেল হক বলেন, দলের পদপদবি ব্যবহার করে যদি কেউ অপকর্মের সাথে যুক্ত
হন। তাদের কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা
হবে। অপরাধ করে কেউ পার পাবে না।
ঢাকা মহানগর উত্তর যুব মহিলা লীগের নতুন
কমিটিতে সভাপতি সাবিনা আক্তার তুহিন ও সাধারণ সম্পাদক তাহেরা খাতুন লুৎফা
এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুব মহিলা লীগের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন ঝুমা ও
সাধারণ সম্পাদক নিলুফার ইয়াসমিন। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুব মহিলা লীগের
সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন ঝুমা ডিসেম্বর মাসে মারা গেছেন।
ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যক্রম
এক মাসের জন্য স্থগিত করায় মার্চে এই সংগঠনের সম্মেলন করার কোনো সম্ভাবনা
নেই। আওয়ামী লীগ নিয়মিত কাজ থেকে একটু দূরে সরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ
মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকীর আয়োজনে গুরুত্ব দিচ্ছেন। আগামী মার্চ
মাসে জেলা-উপজেলায় সম্মেলন করা যাবে না, অধীনস্থ কমিটি বাতিল, কিংবা কাউকে
বহিষ্কার করা যাবে না। এপ্রিল মাসে স্থগিত সব সম্মেলন ও কমিটির কাজ
সম্পূর্ণ করা হবে বলে জানিয়েছেন দলটির সিনিয়র নেতারা। তাই মার্চ মাসে
সম্মেলন না করার নির্দেশ দেয়া হয়। এপ্রিল মাস থেকে আবার সারাদেশে সম্মেলনের
কার্যক্রম শুরুর কথা বলা হয়। আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিতসভায় তৃণমূলকে এই
বার্তা দিয়েছেন কেন্দ্রীয় নেতারা।
Comments
Post a Comment