শিশু কম
কথা বলে?
অন্য সব শিশু যখন পুরো বাড়ি মাথায় তুলে রাখে সেখানে
আপনার শিশু ব্যতিক্রম? কম কথা বলে, সহজে প্রশ্ন করতে চায় না। এ নিয়ে
দুশ্চিন্তায় ভোগার সুযোগ নেই বলে জানালেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য
ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. মুনতাসীর মারুফ। লিখেছেন আতিফ আতাউর
ছয়
বছরের ইমাকে নিয়ে অফিসের ফ্যামিলি ডেতে এসেছিলেন তার মা-বাবা। সেদিন
অফিসের সহকর্মীদের ছেলে-মেয়েদের নিয়ে নানা খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক
কর্মকাণ্ডের আয়োজন করা হয়। অন্য সব বাচ্চা যেখানে খেলার মাঠ মাতিয়ে
বেড়াচ্ছে সেখানে ইমা একেবারেই চুপ। সমবয়সী দুজন তাকে ডাকল খেলায় অংশ নিতে।
কিন্তু সে গেল না। মা-বাবা সবার সঙ্গে খেলতে উত্সাহ দিলেও সে নিজেকে নিয়েই
ব্যস্ত। ইমার সবার সঙ্গে কম মেলামেশা নিয়ে খানিকটা দ্বিধাগ্রস্ত মা-বাবা।
এটা কি কোনো অসুখ?
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এটা কোনো অসুখ নয়। এ নিয়ে আলাদা দুশ্চিন্তারও অবকাশ
নেই। শিশুরা সাধারণত চঞ্চল হয়, তবে এর ব্যতিক্রমও আছে। এমন অনেক শিশু আছে
যারা কম কথা বলা পছন্দ করে। হইচই কিংবা লোক সমাগমও এড়িয়ে চলে। শিশুদের
একজনের থেকে আরেকজনের এই ভিন্নতা জন্মগত। অনেক শিশুই নিজের মতো থাকতে
ভালোবাসে। সব জায়গায় সমানভাবে মিশতে পারে না বা হইহই করে গল্প করতে পারে
না। এটা নিয়ে অভিভাবকদের চিন্তিত হতে দেখা যায়। এটা ঠিক নয়। শিশুরা কম বেশি
লাজুক হতে পারে। এজন্যই দেখা যায় একজন কথা বলেই যাচ্ছে আরেক নিশ্চুপ
শ্রোতা। জন্মগতভাবে প্রতিটি শিশুর স্বভাব আলাদা। শিশুর কম কথা বলা দোষের
কিছু নয়। এটা তাদের নিজস্ব স্বভাব। অন্তর্মুখী বা কম কথা বলা শিশুরা
সাধারণত খুব বেশি চেঁচামেচি, উত্তেজনা বা ভিড়ের জায়গায় ঠিক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ
করে না। অপরিচিত মানুষের সঙ্গে এগিয়ে গিয়ে কথা বলা বা অনেক কথা বলা পছন্দ
করে না। এরা সাধারণত নিজেদের গণ্ডির ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে মিশতে পছন্দ করে।
নতুন কোনো পরিবেশে মানিয়ে নিয়ে অন্যদের তুলনায় বেশি সময় নেয়। এই ধরনের
শিশুদের নতুন বন্ধু তৈরি হতে সময় লাগে। এমনটা হলে প্রথমে দেখতে হবে এটা
কোনো রোগের কারণে হচ্ছে কিনা। ছোটবেলায় বাচ্চারা একটু অন্তর্মুখী বা চুপচাপ
স্বভাবের থাকলেও বয়স হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠিক হয়ে যায়। বেশি মানুষের সঙ্গে
মিশলে এমন স্বভাব আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে আসে। এখনকার বাবা-মায়েরা অনেক বেশি
ব্যস্ত। তারা কাজের চাপে সন্তানকে ঠিকমতো সময় দিতে পারে না। টেলিভিশন দেখে
দেখে বাচ্চারা বড় হয়। এতে করে পারস্পরিক কথাবার্তা বিনিময়ের সুযোগ থেকে
অনেক সময় শিশুরা বঞ্চিত হয়। এটা থেকেও শিশুদের মধ্যে কম কথা বলার স্বভাব
গড়ে উঠে।
সন্তানের স্বভাব এমন হলে তাকে জোর করতে যাবেন না। এতে ওর কোমল মনের ওপর
অতিরিক্ত চাপ পড়বে। বরং নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে সন্তানকে সময় দিন।
ছোটবেলা থেকেই সন্তানের সঙ্গে বেশি বেশি কথা বলার চেষ্টা করুন। সন্তান কোনো
কথায় সাড়া দিলে সে বিষয়ে তাকে আরো বেশি উত্সাহ দিন। সন্তানের মেলামেশার
পরিধি ও বন্ধু বাড়াতে উত্সাহ দিন। এ ধরনের শিশুরা সাধারণত খুব সংবেদনশীল
হয়। অল্পতেই রেগে যায়। তারা নিজেদের নিয়ে ইয়ার্কি-ঠাট্টা পছন্দ করে না।
শিশু যদি কল্পনা করতে, ছবি আঁকতে বা কবিতা লিখতে ভালোবাসে তবে তাকে সে
বিষয়েও উত্সাহ দিন। দিনের কিছুটা সময় শিশুকে তার মত করে কাটানোর সুযোগ দিন।
সন্তান যে স্কুলে পড়ে সেখানকার শিক্ষকদের ওর স্বভাব সম্পর্কে আগে থেকেই
জানিয়ে রাখুন। এ ধরনের শিশুদের নিয়ে অনেক সময় সহপাঠীরা মজা করে। এটা আপনার
শিশুর পছন্দ নাও হতে পারে। রেগে নিয়ে নিজের বা অন্যদের ক্ষতি করে বসতে
পারে। সবাই হৈচৈ পছন্দ করলেও আপনার সন্তানটিও যে তা-ই করবে, এমন আশা করা
ঠিক নয়। প্রতিটি শিশুই আলাদা আর নিজের মত সুন্দর। মা-বাবা হিসেবে সন্তানের
সুবিধা-অসুবিধা দেখা আপনারই দায়িত্ব। বাচ্চার সুন্দর চাওয়াকে প্রাধান্য
দিন। সব সময় সন্তানের পাশে থাকুন।
Comments
Post a Comment