হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে মেয়েদের বড় করুণ অবস্থা। হিন্দুু
উত্তরাধিকার আইনে বিবাহিত কন্যাসন্তান তার পিতার সম্পত্তিতে কোনো ওয়ারিশ হয়
না। এজন্য বিবাহের সময় হিন্দু মেয়েদের যৌতুক দেয়ার প্রথা প্রচলিত।
অবিবাহিতা মেয়েরা বিবাহের পূর্বে পর্যন্ত এবং চিরকুমারী কন্যারা
জীবনস্বত্বে পিতার সম্পত্তি থেকে ভরণ-পোষণ পায়। হিন্দু বিধবা নারী কেবল তার
জীবনস্বত্বে মৃত স্বামীর ত্যজ্যবিত্ত সম্পত্তিতে ভোগদখলের অধিকার লাভ করে।
একমাত্র ভোগদখল ছাড়া বিধবা সেই সম্পত্তি বিক্রি, বন্ধক বা অন্য কোনোপ্রকার
হস্তান্তরের অধিকার লাভ করে না। বিধবার মৃত্যুর পর সেই সম্পত্তি পুনরায়
মৃতের ভাইদের কাছে চলে আসে। ভাই-এর অবর্তমানে ভাই-এর পুত্রেরা সেই
সম্পত্তির মালিকানা লাভ করে।
উত্তরাধিকার আইন খুব জটিল। নিবন্ধ বা প্রবন্ধে এর বিস্তারিত
আলোচনা সম্ভব নয়। তাছাড়া উত্তরাধিকার আইনের অনুপুঙ্খ আলোচনা সবার জন্য
সহজবোধ্যও নয়, যেটুকু জানলে কিছুটা উপকারে আসবে, সেটুকু আলোচনা করছি।
মুসলিম উত্তরাধিকার বা ফারায়েজ কি :
ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী কোনো মুসলমান মারা গেলে তাহার ফেলে যাওয়া সম্পত্তি বা
ত্যাজ্য সম্পত্তি কিভাবে কাদের মধ্যে বণ্টন করা হইবে সে সম্পর্কিত বিধানকে
মুসলিম উত্তরাধিকার বা ফারায়েজ বলে গণ্য হয়।
উত্তরাধিকার আইনের উৎসসমূহ :
১. আল-কোরআন, ২. হাদিস ও সুন্নাহ, ৩. ইজমা, ৪. কিয়াস, ৫. আরবীয় প্রথা, ৬. বিধিবদ্ধ আইন, ৭. আদালতের সিদ্ধান্ত।
পুত্র সন্তানের অংশ :
মৃত ব্যক্তির ছেলে বা ছেলেরা সব ক্ষেত্রেই সম্পত্তি পেয়ে থাকে। যে ক্ষেত্রে
মৃত ব্যক্তির ছেলে ও মেয়ে রয়েছে সেক্ষেত্রে ছেলে বা ছেলেরা, মেয়ে বা
মেয়েদের চেয়ে দ্বিগুণ সম্পত্তি পাবে। মৃত ব্যক্তির সম্পত্তিতে পিতা-মাতা ও
স্বামী-স্ত্রী নির্দিষ্ট সম্পত্তি পাওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পত্তি ছেলেমেয়ের
মধ্যে বণ্টন করা হইবে। তবে মেয়ে না থাকিলে অংশীদারদের অংশ দেওয়ার পর
অবশিষ্টাংশ ভোগী হিসাবে বাকি সম্পূর্ণ সম্পত্তি ছেলে বা ছেলেরাই পাবে।
কন্যা সন্তানের অংশ :
উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে কন্যারা তিনভাবে পিতা-মাতার সম্পত্তি পেতে পারে।
(ক) একমাত্র কন্যা হলে তিনি রেখে যাওয়া সম্পত্তির দুই ভাগের এক ভাগ বা
(১/২) অংশ পাবে। (খ) একাধিক মেয়ে হলে সবাই মিলে সমানভাবে তিন ভাগের দুই ভাগ
বা (২/৩) অংশ পাইবে। (গ) যদি পুত্র থাকে তবে পুত্র ও কন্যার সম্পত্তির
অনুপাত হইবে ২:১ অর্থাৎ এক মেয়ে এক ছেলের অর্ধেক অংশ পাবে। তবে, যাই হোক না
কেন, কন্যা কখনো পিতা-মাতার সম্পত্তি হতে বঞ্চিত হয় না।
দাদার পূর্বে পিতা মারা গেলে, পিতা জীবিত থাকলে যে পরিমাণ উত্তরাধিকার
সম্পত্তি পেতেন তা তার (পিতার) মৃত্যর পরও তার উত্তরাধিকারীরা পাবে। ১৯৬১
সালের পূর্বে এই নিয়ম ছিল না। পরে একটি আইন পাস করে এই নিয়ম চালু করা হয়।
কারণ এতিমরা যাতে সম্পত্তি হতে বঞ্চিত না হয় সেই সম্পর্কেও ইসলামে নির্দেশ
দেওয়া আছে।
আবার মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে কোনো সন্তানকে ত্যাজ্য বলে ধরা হয় না। ফলে
সম্পত্তি হতে তাকেও বঞ্চিত করা যায় না। তবে কোনো ব্যক্তি রেজিস্ট্রিকৃতভাবে
সম্পত্তি দান বা হস্তান্তর করে গেলে এবং সন্তানকে বঞ্চিত করবার লক্ষ্যে
সন্তানের অংশ উল্লেখ না করে গেলে ওই সন্তান আর সম্পত্তি পাবে না।
মহিলা ও কন্যা সন্তানেরা নিম্ন লিখিতভাবে সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারিত্ব লাভ করে :
(ক) মাতারূপে; (খ) স্ত্রীরূপে; (গ) কন্যারূপে; (ঘ) ভগিনীরূপে।
প্রথম তিন শ্রেণির নারী উত্তরাধিকার আইনে চিরস্থায়ী ভাগিদার। কোনো
অবস্থাতেই সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে এদের বঞ্চিত করা যায় না। তাদের
অংশীদারিত্ব হারায় না বা নষ্ট হয় না। যেমন মাতা তার সন্তানের ত্যজ্যবিত্ত
অর্থাৎ সন্তানের মৃত্যুতে তার রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে সকল অবস্থায় অংশীদার।
কেউ তাকে তার এ অংশীদারিত্ব থেকে বাদ দিতে পারবে না। তেমনি, স্বামীর
ত্যজ্যবিত্ত- সম্পত্তিতে স্ত্রী সর্বাবস্থায় সম্পত্তির ভাগিদার। সে
সন্তানবতী বা সন্তানহীন সকল অবস্থাতেই তার উত্তরাধিকারিত্ব বজায় থাকে। কোনো
অবস্থাতেই তার উত্তরাধিকারিত্বকে হরণ বা লোপ করা যায় না। তবে মাতা,
স্ত্রী, কন্যা উত্তরাধিকার আইনে এদের অংশ সুনির্দিষ্ট। তাই মুসলিম আইনে এ
তিন শ্রেণির নারী সুনির্দিষ্ট অংশীদার। সুনির্দিষ্ট অংশীদারদের বাদ দিয়ে আর
যেসব নারী জ্ঞাতি মৃতের সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারিত্ব লাভ করে তারা হচ্ছে,
মাতার দিক থেকে ঊর্ধ্বগামী বংশধর নারীরা। যেমন : মাতামহী, প্রমাতামহী এবং
তদূর্ধ্বের নারীরা। তেমনি পিতার দিক থেকে পিতামহী, প্রপিতামহী এবং
ঊর্ধ্বগামী নারীগণ। তবে এসব নারীরা কিছু বিশেষ অবস্থার প্রেক্ষিতেই শুধু
মৃতের সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারিত্ব লাভ করে, নতুবা নয়। যেমন মৃতের মাতা
বেঁচে থাকলে মাতামহী উত্তরাধিকারিত্ব হারাবে। তেমনি পিতার জীবিতাবস্থায়
পিতার মাতা অর্থাৎ দাদি মৃতের সম্পত্তিতে কোনো উত্তরাধিকারিত্ব লাভ করবে
না।
এখন মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে সুনির্দিষ্ট ওয়ারিশরা কি হিস্সায় সম্পত্তি পাবে, তার অংশ বলছি।
মৃতব্যক্তির মাতা তার সন্তানের ত্যজ্যবিত্ত সম্পত্তিতে দুই অবস্থায় দুই
ধরণের অংশীদার হন। মৃতব্যক্তি সন্তান রেখে মারা গেলে মায়ের অংশ হবে ১৬
অর্থাৎ মোট সম্পত্তির ৬ ভাগের এক ভাগ, আর মৃতব্যক্তি নিঃসন্তান অবস্থায়
মারা গেলে মা পাবে মোট সম্পত্তির ১৩ ভাগ। অর্থাৎ এক্ষেত্রে মায়ের প্রাপ্য
দ্বিগুণ হয়ে যাবে।
স্ত্রীর প্রাপ্য : স্ত্রীও তার মৃত স্বামীর ত্যজ্যবিত্ত সম্পত্তিতে দুই
অবস্থায় দুই ধরনের অংশীদার হয়। যেমন তাদের যদি সন্তান থাকে তবে স্ত্রীর অংশ
হবে ১৮ ভাগ, প্রচলিত কথায় দু’আনা। আর স্ত্রী নিঃসন্তান হলে তার অংশ হবে ১৪
ভাগ। অর্থাৎ মোট সম্পত্তির চার ভাগের এক ভাগ। এক্ষেত্রে মজার ব্যাপার
হচ্ছে, একই অবস্থায় স্বামীর জীবদ্দশায় যদি স্ত্রী মারা যায়, সেক্ষেত্রে
কিন্তুু হিস্সার ব্যাপারটি আকাশ-পাতাল ফারাক হয়ে দাঁড়ায়। স্ত্রী তার মৃত
স্বামীর ত্যজ্যবিত্ত সম্পত্তিতে যেখানে পাচ্ছে অবস্থা ভিন্নে ১৮ ও ১৪ ভাগ
অংশ, স্বামীর বর্তমানে সেখানে মৃত স্ত্রীর ত্যজ্যবিত্ত সম্পত্তিতে স্বামীর
প্রাপ্য অংশ সোজা দ্বিগুণ অর্থাৎ স্বামী তার স্ত্রীর সম্পত্তিতে হিস্সা
পাবে নিঃসন্তান অবস্থায় ১২ অর্থাৎ মোট সম্পত্তির অর্ধেক আর সন্তান থাকলে
পাবে ১৪ ।
এ বৈষম্যমূলক বিধান নিয়ে আমাদের দেশের নারী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন
করে যাচ্ছে, বৈষম্য দূরীকরণের জন্য। সমতাভিত্তিক আইনের জন্য।
উত্তরাধিকার আইনে নারী-পুরুষের এ বৈষম্যমূলক বণ্টন ব্যবস্থা আমাদের দেশে
জনসংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। পুত্রহীন পিতা-মাতা একটি পুত্র সন্তানের
আশায় একের পর এক কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়ে চলেন শুধুমাত্র রেখে যাওয়া
সম্পত্তির উত্তরাধিকারের জন্য।
কন্যা : কন্যাসন্তান তার মৃত পিতার সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারী হিস্সা প্রাপ্ত
হয়, সুনির্দিষ্ট অন্যান্য উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য অংশ বুঝিয়ে দেয়ার পর যা
অবশিষ্ট থাকে সেই অবশিষ্টাংশ পুত্র-কন্যাদের মধ্যে ভাগ হয়। কন্যা তার
ভাই-এর সাথে ভাগ পায়-দুই কন্যা সমান এক পুত্র হিসেবে। অর্থাৎ কন্যার
দ্বিগুণ পাবে পুত্র।
কোনো পিতা-মাতার যদি পুত্র-সন্তান না থাকে শুধু একটি মাত্র কন্যাসন্তান
থাকে তবে সেক্ষেত্রে কন্যাসন্তানের অংশ হবে সুনির্দিষ্ট ১২ ভাগ। যদি চারজন
কন্যা রেখে মারা যায় তবে সেক্ষেত্রে ৩ ভাগের ২ ভাগ প্রাপ্য হবে চার কন্যার।
এখানে চার কন্যার জন্য সম্পত্তির অংশ বেড়ে যাবে না।
মৃতের বোনেরা কিছু বিশেষ অবস্থার প্রেক্ষিতে মৃত ভাই-এর ত্যজ্যবিত্ত
সম্পত্তিতে অংশীদার হয়। অবস্থাগুলো হচ্ছে, (ক) যদি মৃতব্যক্তির কোনো
সন্তান-সন্ততি না থাকে। (খ) যদি মৃতের পিতা অথবা মাতা জীবিত না থাকে। (গ)
যদি মৃতের আপন কোনো ভাই জীবিত না থাকে, কেবল সেই ক্ষেত্রে মৃতের সম্পত্তিতে
তার বোন অংশের হকদার হবে। এ হচ্ছে সংক্ষিপ্তাকারে মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে
মহিলাদের অংশভাগ।
হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে মেয়েদের বড় করুণ অবস্থা। হিন্দুু উত্তরাধিকার আইনে
বিবাহিত কন্যাসন্তান তার পিতার সম্পত্তিতে কোনো ওয়ারিশ হয় না। এজন্য
বিবাহের সময় হিন্দু মেয়েদের যৌতুক দেয়ার প্রথা প্রচলিত। অবিবাহিতা মেয়েরা
বিবাহের পূর্বে পর্যন্ত এবং চিরকুমারী কন্যারা জীবনস্বত্বে পিতার সম্পত্তি
থেকে ভরণ-পোষণ পায়। হিন্দু বিধবা নারী কেবল তার জীবনস্বত্বে মৃত স্বামীর
ত্যজ্যবিত্ত সম্পত্তিতে ভোগদখলের অধিকার লাভ করে। একমাত্র ভোগদখল ছাড়া
বিধবা সেই সম্পত্তি বিক্রি, বন্ধক বা অন্য কোনোপ্রকার হস্তান্তরের অধিকার
লাভ করে না। বিধবার মৃত্যুর পর সেই সম্পত্তি পুনরায় মৃতের ভাইদের কাছে চলে
আসে। ভাই-এর অবর্তমানে ভাই-এর পুত্রেরা সেই সম্পত্তির মালিকানা লাভ করে।
বাংলাদেশে খ্রিস্টান উত্তরাধিকার আইন, ১৯২৫ সালে ভারতীয় উত্তরাধিকারিত্ব
আইন (অপঃ-ঢঢঢওঢ ড়ভ ১৯৯৫) যা দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির ৪৮/৭২ নং
আদেশ দ্বারা ২৬-৩-৭১ইং তারিখ থেকে বলবৎ হয়েছে।
খ্রিস্টান উত্তরাধিকারিত্ব আইনে উত্তরাধিকারিত্ব অর্জনে নারী-পুরুষের অংশের
বৈষম্য করে নাই। পিতার ত্যজ্যবিত্ত সম্পত্তিতে পুত্র এবং কন্যা সমান অংশের
অংশীদার। খ্রিস্টধর্মের কোনো লোকের একপুত্র এবং চারকন্যা থাকলে, সম্পত্তি
পাঁচ অংশে ভাগ হবে।
খ্রিস্টান বিধবা নিঃসন্তান অবস্থায় স্বামীর সম্পূর্ণ সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারিত্ব লাভ করে।
এ হচ্ছে সংক্ষিপ্তাকারে বাংলাদেশ প্রচলিত বিভিন্ন ধর্মাবল€^ী নারীদের
উত্তরাধিকার আইনে অংশ প্রাপ্তির হিস্সা। তবে বাংলাদেশের মুসলিম এবং হিন্দু
নারী উত্তরাধিকার আইনের সংশোধনের জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে।
মায়ের সম্পত্তিতে মেয়েদের অধিকার
আমাদের সমাজে প্রচলিত একটি ধারণা আছে যে, মায়ের সম্পত্তিতে একমাত্র অংশীদার
হকদার এবং দাবিদার হচ্ছে মেয়ে বা কন্যাসন্তান। কিন্তুু এটা সম্পূর্ণ ভুল
ধারণা। কারণ সম্পত্তি সে পিতারই হোক বা মাতার হোক মৃত ব্যক্তির ত্যজ্যবিত্ত
সম্পত্তিতে পুত্র এবং কন্যার হকদায়িত্ব বা অংশীদারিত্ব উত্তরাধিকারী আইনের
সুনির্দিষ্ট বিধান অনুযায়ী হবে। উত্তরাধিকার আইনে মৃত ব্যক্তির
ত্যজ্যবিত্ত- সম্পত্তির কথা বলা হয়েছে। সেখানে পিতা বা মাতার সম্পত্তির
অংশীদারিত্ব নিয়ে কোনো বিভাজন করা হয়নি, মায়ের মৃত্যুর পর মায়ের সম্পত্তিতে
মেয়েরা সম্পূর্ণ সম্পত্তির অংশীদার হবেন বা ছেলে-সন্তানের তুলনায়
মেয়ে-সন্তান বেশি সম্পত্তি পাবেন, এমন কোনো বিধান নেই তবে আমাদের সমাজে,
পরিবারে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মায়ের গহনা, ব্যবহার্য পোশাক-আশাক, শাড়ি,
জামাকাপড়, এসব মেয়েরাই নিয়ে থাকে মায়ের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে। ভালোবাসায়
আপ্লুত হয়ে এবং সেটা নেয়ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের স€§তিতেই। এসব মায়ের
অস্থাবর সম্পত্তি । এখানে আইনের কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশ নেই।
অস্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে মায়ের ব্যবহার্য গহনা বা পোশাক-আশাক নেয়ার জন্য
স্থাবর সম্পত্তি যেমন বাড়ি-ঘর জমি-জায়গা ব্যাংকে জমানো টাকা-কড়ি থেকে
বোনদের বঞ্চিত করতে পারবে না। এখানে ভাই-এর সাথে বোন সুনির্দিষ্ট অংশীদার।
ছেলে সন্তানের অবর্তমানে মেয়ের উত্তরাধিকার
জনাব রহিম মিয়া মারা যাওয়ার সময় স্ত্রী, এক মেয়ে এবং এক ভাই রেখে যান।
মুসলিম আইন অনুসারে তার মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া সম্পত্তির অর্ধেক তার
মেয়ে এবং এক-অষ্টমাংশ পাবেন তার স্ত্রী। সে হিসাবে পুরো সম্পত্তির আট ভাগের
পাঁচ ভাগ এ দুজনের মধ্যে বন্টন হওয়ার পর বাকি আট ভাগের তিন ভাগ আসাবা
হিসাবে পেয়ে যাবেন রহিম মিয়ার ভাই। পক্ষান্তরে, রহিম মিয়া যদি মারা যাওয়ার
সময় স্ত্রী, ভাই এবং এক মেয়ের সাথে একজন ছেলে সন্তানও রেখে যাতেন,
সেক্ষেত্রে সম্পত্তি বণ্টনের হিসাব-নিকাশ অন্য রকম হয়ে যেত। এ অবস্থায়
স্ত্রী এক-অষ্টমাংশ নেওয়ার পর বাকি আট ভাগের সাত ভাগ তার ছেলেমেয়ের মধ্যে
২:১ হারে বণ্টিত হয়ে যেত এবং রহিম মিয়ার ভাই সম্পত্তিতে কোনো অংশ পেতেন
না।
এর অর্থ হলো রহিম মিয়ার মৃত্যুতে পর তার ছেলে না থাকলে সম্পত্তির বড় একটা
অংশ পরিবারের বাইরে অর্থাৎ তার ভাইয়ের কাছে চলে যাচ্ছে। পক্ষান্তরে,
মৃত্যুকালে ছেলে রেখে গেলে তার এ সম্পত্তি পরিবারের বাইরে যাচ্ছে না। ইসলাম
একটি কমিউনিটিভিত্তিক জীবনব্যবস্থা, যেখানে পরিবারের চেয়ে সমাজ কিংবা
কমিউনিটির স্বার্থ বেশি দেখা হয়। এ কারণে পারিবারিক গ-ির বাইরেও কাউকে
কাউকে সম্পত্তি দেয়া হয়ে থাকে। কমিউনিটিভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় রহিম মিয়ার
মৃত্যুর পর তার কোনো ছেলে সন্তান না থাকায় তার স্ত্রী এবং মেয়ের দেখাশোনার
নৈতিক দায়িত্ব তার ভাইয়ের ওপর বর্তায় বলে মুসলিম আইনে রহিম সাহেবের ভাইকেও
সম্পত্তির কিছু অংশ দেয়া হয়েছে।
তবে, পুত্রসন্তানের অনুপস্থিতির কারণে যে অংশটুকু পরিবারের বাইরে চলে
যাওয়ার কথা, সেটুকু অংশ পিতা তার জীবদ্দশায় কন্যাসন্তানের অনুকূলে উইল করে
দিয়ে যেতে পারেন অথবা জীবদ্দশায় কন্যা সন্তানকে সে অংশটুকু হেবা করে দিতে
পারেন। তবে, এ দুই উপায়েই বিশেষ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে যেমন, কোনো ব্যক্তির
মৃত্যুর পর তার সম্পত্তিতে যারা নির্ধারিত অংশ পাবেন, তাদের উইল করতে হলে
যার অনুকূলে উইল করা হবে, তার সহ-শরিকদের মতামত গ্রহণ করতে হয়। সে হিসাবে
কন্যা যেহেতু পিতার সম্পত্তিতে নির্দিষ্ট অংশ পেয়ে থাকে, তার অনুকূলে
সম্পত্তি উইল করতে হলে পিতাকে অন্য সহ-শরিকদের স€§তি গ্রহণ করতে হবে; যা
বাস্তবে বেশ কঠিন ব্যাপার। আবার জীবদ্দশায় কন্যাসন্তানের অনুকূলে হেবা বা
সম্পত্তি দান করবারও একটা ঝুঁকি রয়েছে। হেবা সাধারণত তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর
হয় বলে হেবা ঘোষণার সাথে সাথেই তার মালিক হয়ে যায় হেবা গ্রহিতা। এখন
সম্পত্তি যদি বাবা-মা তার মেয়ের অনুকূলে হেবা করে দেন, সেক্ষেত্রে বাবা তার
জীবদ্দশায় অনিরাপদ বোধ করতে পারেন। কারণ সম্পত্তি তখন আইনগতভাবে আর তার
মালিকানায় থাকে না। সম্পত্তিহীন-ভাবে বাকি সময়টা মেয়ের গলগ্রহ হয়ে পড়ে
থাকার ঝুঁকি তাই কোনো বাবা-মা নিতে চান না।
পুত্রের অবর্তমানে কন্যাকে মৃত পিতার অবশিষ্ট সম্পত্তি প্রদান করে আইন
প্রণয়নের ব্যাপারে বাংলাদেশ আইন কমিশন বেশ পূর্বেই সরকারের কাছে সুপারিশ
করেছে। কমিশনের দাবি, ইসলামি নীতির মধ্যে হতেই এভাবে আইন প্রবর্তন করা
সম্ভব। এ প্রসহিত তারা ইন্দোনেশিয়ার সর্বোচ্চ আদালতের একটি রায়কে উল্লেখ
করেছে। ইন্দোনেশিয়ার আদালত ছেলে সন্তানের অনুপস্থিতিতে মেয়ে সন্তানকে মৃত
পিতার উত্তরাধিকার সম্পত্তির অবশিষ্টাংশ প্রদানের পক্ষে রায় প্রদান করেছেন।
রায়ে যুক্তি দিয়ে বলা হয়েছে, সূরা নিসার ১৭৬ ন€^র আয়াত অনুসারে নিঃসন্তান
ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার সম্পত্তি জীবিত ভাই-বোনের কাছে চলে যায়। এ আয়াত
হতে বোঝা যায়, মৃতের সন্তান-সন্ততি না থাকলে তবেই সম্পত্তি মৃতের
ভাই-বোনদের কাছে চলে যাবে। সুতরাং মৃতের সন্তান থাকলে তার ভাইবোনেরা সেই
সম্পত্তিতে অংশ পাবে না, সেটিই এ আয়াত হতে সাব্যস্ত হয়। নিঃসন্তান ব্যক্তি
বলতে বর্তমানে এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়, যার ছেলে সন্তান নেই; অথচ কোরআন
শরিফে সন্তান বলতে পুরুষবাচক কোনো শব্দ উল্লেখ করা হয়নি। সে হিসাবে একজন
মেয়ে সন্তান থাকলেও মৃতের সম্পত্তি তার ভাইবোনদের কাছে যাবে না বলে এ আয়াত
হতে সাব্যস্ত করা সম্ভব। সুতরাং, মৃতের ছেলে সন্তানের অবর্তমানে যে
সম্পত্তি বর্তমানে মৃতের ভাইবোন বা দূরের কোনো আত্মীয়ের কাছে চলে যাচ্ছে,
তা কন্যাসন্তানের অনুকূলে প্রদান করে বিশেষ আইন করবার পক্ষপাতী বাংলাদেশ
আইন কমিশন।
Comments
Post a Comment